top of page

অমৃতস্য পুত্রা।

By Prasun Mukherjee


হয় গরমের ছুটি না হয় পূজার

 ছুটি,বছরে একবার মামার বাড়ি বেড়াতে যাওয়া বাঁধা ছিল ছেলেবেলায়।ন' মামা নিতে আসতেন প্রতিবার। আমরা পাঁচ ভাইবোন মা মামা সবাই মিলে কু ঝিকঝিক গাড়ি চেপে সাত থেকে দশদিনের আনন্দ সফর।বড় আনন্দের দিন ছিল সে সব।


আমি তখন পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র। তেমনি এক যাত্রাকালে কামরায় উঠে পড়ল আমার ই বয়সী এক কিশোর। মায়াময় চোখ দুটো। পরনে তাপ্পি মারা জামা প্যান্ট।হাতের ভঙ্গিমায় মনগড়া গুপগুপি। বাউল গান ধরলো 


বনমালী তুমি পরজনমে হইয়ো রাধা।


অবলিলায় ছুঁয়ে যাচ্ছিল শিখর ।খাদে তেমন স্বচ্ছন্দ ছিল না বটে কিন্তু চেষ্টার ত্রুটি ছিল না।চোখ বন্ধ করে অর্ঘ্য নিবেদন করছিল প্রাণের বনমালীকে।

গান শেষ হলেও রেশ রয়ে গেল মনে। পাঁচ টাকা পুঁজি থেকে এক টাকা দিয়ে দিলাম স্বচ্ছন্দে। হেসে হাত মাথায় ঠেকিয়ে চলে গেল পরের কামরায়।


যাত্রাসঙ্গী এক কাকা জানালেন ছেলেটা অনাথ।নাম উদয়। থাকে স্টেশন লাগোয়া এক ভাঙাচোরা ঘরে। গোটা দিন ঘুরে বেড়ায় বাউলদের পেছনে।গান শেখে। তাদের হাজার কাজ করে দেয়। বিকেল বেলা ফিরে আসে ঘরে।স্নান করে ভাত ডাল আলু সেদ্ধ করে।ভাগ করে নেয়  তিন চারটে পথ কুকুরের সঙ্গে।

কোনদিন ভিখারি ও জোটে দু একজন।

এরপর একটু বিশ্রাম নিয়ে শুরু হয় গান। চলে অনেক রাত পর্যন্ত।এখন গোবিন্দ বাউলের কাছে গান শিখছে। উনি ই শিখিয়েছেন এই গানটা।


ছবির মত সব গেঁথে আছে মনে। এখনও বুঝি দেখতে পাই চোখ বুজে।


একটু বড় হয়েছি তখন। এইট নাইনে পড়ি বুঝি। বাজার পাড়ায় হঠাৎ দেখি অজিতদাকে। ঝকঝকে এক রিকশায় বড় ব্লাডারে লাগানো পেতলের হর্ণ বাজিয়ে হাসতে হাসতে আরোহী নিয়ে চলেছে।বেশ মনে ধরলো।

দোকানদার রামকাকাকে জিজ্ঞেস করতে বললেন নতুন এসেছে এখানে। মাসদুয়েক। বৃন্দাবন কাকার বাড়ির বারান্দায় থাকে। ওদের হাজার ফাই ফরমাশ খাটে।দিনে রিক্সা চালায় রাতে বাঁশি বাজায়। বৃন্দাবন কাকা ই খেতে দেন রাত্রিতে।

বুকের মাঝে এক আনন্দ সাগর ছিল যেন অজিতদার। ছোট খাট কথায় হাসতো হা হা করে। নানা রকম পাখির ডাক ডাকতো অবিকল। মানুষের দুঃখ বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়তো সবকিছু ভুলে।

বুকে যেন শরতের খুশি এনে দিল অজিতদা।

ভাব জমালাম কয়েক দিনের মধ্যেই।এক বৃষ্টি বাদলার দিনে বিকেলে একটু সাধাসাধি করে শুনে নিলাম অসাধারণ বংশী বাদন ।


আলো আমার আলো ওগো আলো ভুবন ভরা।


আনন্দের হাট বসলো যেন মনে।

সংসারে কেউ নেই অজিতদার। বহু দূর সম্পর্কের এক পিসির ঘরে থাকতো লাভপুরে। পিসি মারা যেতে ঘর ছেড়েছে।


দু তিন বছর পর কোন এক পরিচিতের হাত ধরে কলকাতা চলে গেল অজিতদা।


হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে কলেজে ভর্তি হলাম।  কলেজের একটু আগে আলিদার চায়ের দোকান। ছোট  ছিটেবেড়ার ঘর। বিক্রিবাটা ভালো।

আলিদার দোকানে দেখি বছর দশ বারোর এক বাচ্চা। ধপধপে রং মাথা ভর্তি চুল। চোখে মুখে এক আশ্চর্য উদাসীনতা।নাম বাবলু।

টুকটাক সব কাজ করে দোকানের। উনুন ধরানো কাপ প্লেট ধোয়া এমনকি চা করা। ঘুগনিটা করতে শেখেনি এখনো।

খুব স্নেহ করেন আলিদা।

 

আমার ছেলে গো। হাসপাতাল থেকে বৌ নিয়ে এসেছিল বছর দশেক আগে। তখন ও দশ বারো দিনের হবে।ওর মা ফেলে চলে গেছিল। সেই থেকেই আমাদের সাথে।

প্রানখোলা হাসি হাসে আলিদা। বেটা কিন্তু আমাদের বাপ মা বলেনা।

বলে চাচা চাচী। ছোট বেলায় বলতো। তারপর একদিন পাড়ার কেউ বলে দিল আমরা আসল মা বাপ নই।

পাঁচ ছ বছরের ছেলে পালালো ঘর ছেড়ে।ওর মা কেঁদে কেঁদে পাগল। অনেক খোঁজাখুঁজি করে তিন দিন পর আমোদপুর স্টেশনে খুঁজে পেলাম।

আর কোথাও যায়নি তারপর। চুপ করে ছিল ক'দিন।

এরপর থেকে আমরা চাচা চাচী হয়ে গেলাম।

না গো খুব ভালবাসে ওর চাচিকে আমাকে। আমাদের তো ছেলেপুলে হলো না।ওই আমাদের সব।


চোখ ভরে দেখলাম বাবলুকে। মনে এক আত্মীয়ের রং লাগল যেন।

অনেক চেষ্টা করেছি ভাব জমানোর।ধরা দেয় নি তেমন করে। অথচ কি এক টানে বেঁধে রেখেছিল আমাকে।প্রায়ই ফেরার পথে ঢুঁ মারতাম একবার।চা খাওয়া ছিল নেহাতই অছিলা। কাজের ফাঁকে ফাঁকে কখনো কখনো শিষ দিয়ে গান গাইতো বাবলু।বেশ লাগতো শুনতে।


চাকরি পেয়ে প্রথম পোষ্টিং সাঁইথিয়া স্টেশনে।নাইট ডিউটি মাসে দশবারো দিন।কাজেই স্টেশন থেকে একটু দূরে একটা ঘর ভাড়া করে থাকা।

এক ছুটির দিন দুপুরে হঠাৎ কানে এলো এক ফেরিওয়ালার ডাক।

রসুন আদা লিবে গো

রঅঅসুউউন আআআদাআআ।


অদ্ভুত সুরেলা কণ্ঠ। ছুটে বেরিয়ে এসে দেখি দীর্ঘকায় শীর্ণ মানুষ।একমুখ দাড়ি। মাথায় এক ঝুড়ি নিয়ে আদা রসুন ফেরি করতে নেমেছেন পথে।

বেশ লাগল নতুন ফেরিওয়ালা কে।ডাক দিলাম ঘরে। নিলাম খানিকটা। মায়ের তৈরী নাড়ু ছিল কৌটোয়। দিলাম চারটে একটা প্লেটে করে। সঙ্গে এক গ্লাস জল।

হৃদয় দ্রবীভূত হয়ে গেল ফেরিওয়ালার।মাথার পাগড়ি খুলে বসলো আমার উঠানে। ধীরে ধীরে ভাব জমে উঠলো। স্টেশনের পেছনে এক পুরাতন মন্দিরের ভাঙা চোরা বারান্দায় বাস করেন তিনি।নাম অপূর্ব রায়।আদি নিবাস উত্তরবঙ্গ। বছর ছয়েক এই লাল মাটির দেশে।এর আগে ছিলেন সিউড়ি বোলপুর আর নলহাটিতে।গত বছর থেকে সাঁইথিয়ায়। এরপর যাবেন রামপুরহাট তারাপিঠ।


বুকে আসন পেতে বসিয়ে নিলাম অপূর্বদাকে।বয়স পঞ্চাশ বাহান্ন। বাউল গানের প্রেমে পড়েছেন তখন। সংসারে শেষ বাঁধন ছিলেন মা।মারা গেছেন বছর দশেক।এখন চষে বেড়ান নানা দেশে। খোঁজ করেন মনের মানুষের।


একদিন বলি অসুখ বিসুখ হলে দেখবে কে।

দু'হাত তুলে ওপর পানে চেয়ে

হাত জড়ো করে বুকে ঠেকান।

চোখে প্রেম মুখে মধুর হাসি।


তারপর থেকে মাঝেমধ্যেই সন্ধ্যা হলে যেতাম ওর আস্তানায়। চারিদিকে ঘন আগাছা। লোক লাগিয়ে পরিষ্কার করিয়েছি আমি। তবু অন্ধকারে গা শিরশির করে। রেলের ভাঙাচোরা লন্ঠন সারিয়ে দিয়েছি দুটো।

হাসতেন অপূর্ব দা।ওরে আমাকে কেউ ছোঁবে না। চাল ডাল আলু পটল সব একসাথে সেদ্ধ হতো হাঁড়িতে।আদা রসুনের চাষ নেই নিজের খাবারে। সে সব বস্তা বন্দী।মাসে দুবার হাট থেকে কিনে নিতেন। বাকি আঠাশ দিন ফেরি করা।


ভাত চাপিয়ে শুরু হতো গান।

কোনদিন শ্যামাসঙ্গীত। কোনদিন রাধাকৃষ্ণের গান কোনদিন বাউল গান। 

বুক ভরে বাতাস নিতেন গান শুরুর আগে।

মন ভরে উঠতো কানায় কানায়।

এক পূর্ণিমা রাতে শুনেছিলাম


মিলন হবে কত দিনে

আমার মনের মানুষের সনে।


আজও পূর্ণিমা রাতে একাকী মাঠে বসে চোখ বন্ধ করে ভাবলে ফিরে আসে সেই রাত। গুপগুপি বাজিয়ে মন্দিরের বারান্দায় গান গাইছেন অপূর্ব দা। ছেঁড়া জামা মাথায় পাগড়ি। এলো মেলো দাড়ি উড়ছে হাওয়ায়।


কখন শেষ হতো সে গান। কখন খেতাম একপাকের অমৃত। কখন ধীরপায়ে ফিরতাম নিজের বাসায় কিছুই মনে পড়েনা।

মন চলে যেত কোন অসীম বিশ্বলোকে যে আপন পর ভুলিয়ে মিলিয়ে দিতো আমার পৃথিবীকে।


বছর খানেক পরই চলে গেলেন অপূর্ব দা। আমাকে মাথার দিব্যি দিয়ে গেলেন ছমাস আগে দেখা না করতে।ওতে নাকি বন্ধন বাড়ে মায়া বাড়ে।

ঠিক ছমাস পর ছুটলাম রামপুরহাট তারাপিঠ। খোঁজ পেলাম না কোথাও।

তারাপিঠে এক দোকানদার বলল হ্যাঁ এমন এক মানুষ এসেছিলেন বটে এক দু'মাস ছিলেন বোধহয়। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ফিরে আসি আমি।বছর দুয়েক পর বদলি হয়ে রামপুরহাট স্টেশনে  জয়েন করি।


উদয় বড় হয়ে খুব নামকরা বাউল হয়েছে। অনেক শিষ্য তার।

বাবলু বিয়ে করেনি। দোকান বড় করেছে। দুচারটে অনাথ ছেলে জোগাড় করে দোকানের কাজে লাগিয়েছে। বুড়ো চাচা চাচীর সেবাযত্ন করে প্রাণভরে।

অজিতদা অপূর্বদার খোঁজ পাইনি আর।


এখন এই অখণ্ড অবসরের দিনে যখন মনে পরে  উদয় অজিতদা বাবলু অপূর্ব দা কে কেমন এক বিহ্বলতায় অবশ হয়ে ওঠে মন। চোখ দুটো ভিজে ভিজে লাগে। মুষ্ঠিবদ্ধ হাত বুকের কাছে চলে আসে আপনা আপনি। চোখ বুজে বলি


তোমার লীলা কে বুঝিতে পারে।


                  ___


By Prasun Mukherjee


Recent Posts

See All
Dumb or In Love

By Kavya Mehulkumar Mehta are poets dumb — or just in love? to the world, they may seem dumb, but for them, love is inevitable. poems are reminders of love that can’t be forgotten, shan’t be forgotten

 
 
 
A Future So Azure

By Inayah Fathima Faeez Tomorrow looms unsure, muffled by the deep Thumbs twiddling, barriers never-ending, failure and nothing to reap At the shore lie the choices, imposing, leading to journeys impo

 
 
 
Letting Go In Layers

By Inayah Fathima Faeez Some part of us is cold and shrivelled, In a body of seemingly endless depth. Some part of us is heavy and dishevelled, Misery filling an unending breadth.  Some part of us is

 
 
 

Comments

Rated 0 out of 5 stars.
No ratings yet

Add a rating
bottom of page